গদ্য

রকিব হাসান; কিশোর মনের রোমাঞ্চকর সময়

কাব্যকলি
  • ১৮-১০-২০২৫

রকিব হাসান; কিশোর মনের রোমাঞ্চকর সময়

আমি রকিব হাসান পড়েছি কলেজ সময়ে। এর পরেও পড়েছি। তবে কিশোর মন সব থেকে বেশি রোমাঞ্চিত হয় রকিব হাসানের লেখায়।

  •                                                                             অলোক আচার্য 
লেখক রকিব হাসানকে আমি চিনতার তাঁর কিশোর গোয়েন্দা সিরিজ দিয়েই। শুধু আমি নই, আমার মতো অনেক কিশোর বেলার নায়ক রকিব হাসানের গোয়েন্দা সিরিজের রবিন। লেখকের সাথে পরিচয়ও সেই সূত্রেই। আমরা অধিকাংশ লেখকের দেখাই পাই না। বই-ই লেখকের সাথে আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সেই লেখকের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা তৈরি হয় পাঠকের মনে। লেখকের মৃত্যু মানেই গভীর শূণ্যতা। সেই শূণ্যতা আর পূরণ হয় না। আর দশটা কিশোরের মতোই আমিও গোয়েন্দা সিরিজের পাঠক। সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশে গোয়েন্দা সিরিজ বা রহস্য গল্প অথবা টানটান উত্তেজনার কোনো গল্প লেখক কমই এসেছেন যতটা রোমান্টিক বা জীবন যাপন ভিত্তিক লেখক এসেছেন। পশ্চিমা দুনিয়ার শার্লক হোমস পড়েছি, ওপার বাংলার ফেলু মিত্তির পড়েছি আর আমাদের রকিব হাসানকে পড়তাম। শার্লক হোমস পশ্চিমা দুনিয়ায় তো বটেই সে গন্ডি ছেড়ে সারা বিশ্বে সেই বিখ্যাত টুপি পড়িয়ে ছেড়েছে কিশোর-তরুণদের। আর ফেলুদা তো এদেশের পাঠকরা গোগ্রাসে গিলেছেন। এই ধারায় আমার দেশের লেখকের বলতে গেলে অভাব ছিল। এখনও যে বেশি রয়েছেন তা নয়। যিনি সেই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেই রকিব হাসান এখন প্রয়াত। কষ্ট লাগলেও এটাই সত্যি। মৃত্যুর কাছে কোনো কারণ নেই। কিশোরদের একটি শ্রেণিকে বইমুখী করা বা বইয়ের পিছনে ছোটানো অথবা বই কেনার কাজটি আজও তেমন কোনো লেখক করতে পারেন না। আসলে পাঠক টার্গেটেড লেখক এখন হচ্ছে না। রকিব হাসান সেটি করতেন। যদিও সেই শ্রেণি নির্দিষ্ট এবং কিশোরদের একটি বড় অংশ। কারণ কিশোর বয়সটাই হলো আগ্রহের, রোমাঞ্চের, ভয়ের এবং আবিষ্কারের। হাতের কাছে তখন এমন রোমাঞ্চ ভরা বইও ছিল না। 
কিছুটা পশ্চিমা ধাঁচের গল্পের পরতে পরতে ছিল রহস্য, রোমাঞ্চ এবং থ্রিল। তাছাড়া সেবা প্রকাশনীর বইগুলো তখন ছড়িয়ে গেছিল মফস্বল অঞ্চলেও। আমরা তখন আবিষ্কার করলাম সেসব চরিত্রের ভিতর আমরা নিজেরাই হারিয়ে যাচ্ছি। কিশোরদের স্বভাব সুলভ অতি কল্পনা বিলাসী মন এই কাজটি করতে আরম্ভ করলো। গল্পের চরিত্রগুলো কিশোরদের ভিতরে ঢুকে গেলো। বিখ্যাত রহস্য পত্রিকায় আমিও দু’চারটা গল্প লিখেছি। পাঠক হওয়ার সূত্রে লেখা। রবিক হাসান পড়াশোনা শেষে বিভিন্ন চাকরিতে যুক্ত হলেও বাঁধাধরা জীবনে মন টেকেনি, বেছে নেন লেখালেখি। সেবা প্রকাশনী থেকে তাঁর লেখক জীবনের সূচনা। পাশাপাশি সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন ‘রহস্যপত্রিকা’য়। প্রথম দিকে বিশ্বসেরা ক্ল্যাসিক বই অনুবাদ করেছেন। এরপর লিখে গেছেন ‘টারজান’, ‘গোয়েন্দা রাজু’, ‘আরব্য রজনী’, ‘রেজা-সুজা’ সিরিজসহ চার শতাধিক জনপ্রিয় বই। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজ বা কিশোর, মুসা ও রবিনের মতো চরিত্রগুলোর স্রষ্টা হিসেবে। দুর্দান্ত সব চরিত্র। কোনো চরিত্রকে বিখ্যাত করে তোলা বা পাঠকের কাছে জীবন্ত করা এটাও দক্ষতার চূড়ান্ত ছাপ। সবাই যেন তখন তিন গোয়েন্দার একজন হওয়ায় ব্যস্ত! বিখ্যাত ম্যাকগাইভার সিরিয়ালের কথা মনে আছে কারো? সেই সময় আমাদের কিশোর মন চাইতো ম্যাকগাইভার হতে। তাঁর মতো বুদ্ধি রাখতে। সিরিজের প্রথম বই ‘তিন গোয়েন্দা ও সোনার মূর্তি চুরি’ থেকে শুরু করে ‘তিন গোয়েন্দা ও ভূতুড়ে দ্বীপ’ পর্যন্ত প্রতিটি গল্পে রহস্যের জাল বিস্তারিত হয়েছে এমনভাবে যে, পাঠকেরা নিজেরাই গোয়েন্দা হয়ে উঠেছে। 
রকিব হাসানের প্রথম বই প্রকাশিত হয় ছদ্মনামে, ১৯৭৭ সালে। স্বনামে প্রথম প্রকাশ অনুবাদগ্রন্থ 'ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা' দিয়ে। তিনি আরও অনুবাদ করেছেন এরিক ফন দানিকেন, ফার্লে মোয়াট, জেরাল্ড ডুরেলের মতো বিখ্যাত লেখকদের ক্লাসিক বই। অনুবাদ করেছেন অ্যারাবিয়ান নাইটস ও এডগার রাইস বারোজের টারজান সিরিজ। তিন গোয়েন্দা সিরিজের মোট বইয়ের সংখ্যা ১৬০। অনুবাদ করেছেন ৩০টি বই। পাঠকদের টার্গেট করে কিছু না করলে প্রকৃতপক্ষে সেভাবে লেখক হয়ে ওঠা যায় না। যেমন- বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তার বইয়ে টেনেছিলেন অনেকটা সেরকম। আমার লেখার পাঠক কারা হবেন সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। কেন পড়বে, বা কেন আমার লেখা বই পাঠক কিনবে সেই উত্তরও জানা থাকা দরকার। যেটুকু জেনেছি লেখক রকিব হাসান তাঁর ব্যক্তি জীবনে অনেক চাকরির সুযোগই পেয়েছেন এবং সেসবও যথেষ্ট ভালো। তিনি সেসবে যোগ দেননি। লেখাই তাকে টেনেছে মন্ত্রের মতো। সহিত্যের ইতিহাসের অংশ হওয়া সহজ কিছু না। বরং চ্যালেঞ্জের। যদিও প্রথম বাক্যেই রকিব হাসানকে কিশোর সাহিত্যিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়, আসলে এই সিরিজের বইগুলো কিন্তু শুধু কিশোররা পড়েন না। এর কারণ হলো প্রত্যেক মানুষের ভিতর তার অতীত বাস করে। সেই অভ্যাস, ভালো লাগা ঠিক একবারেই বন্ধ হয় না। এটা চলতেই থাকে। কিশোর থেকে যুবা সবাই এই বইগুলো পড়েছে। যারা অন্তত রহস্য ভালোবাসে। মানুষের জীবনটা আগাগোড়া রহস্যের। সেই রহস্যের স্বাদ মানুষ পায় বইয়ের পাতায়। যখন রকিব হাসানের মতো কোনো লেখক টেনে নেওয়ার কাজটি করতে পারেন তখন পাঠক ছুটতে থাকে সেইসব চরিত্রের পিছনে। রকিব হাসানের ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছিল। মৃত্যুর অতলে সকলকেই একদিন ডুবে যেতে হয়। তিনিও না হয় গেছেন। আমাদের কাছে থেকে গেছে তাঁর অমর সাহিত্যকর্ম।

শেয়ার করুন:
কাব্যকলি

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...