গদ্য

যেভাবে পৃথিবীতে এলো দুঃখ, কষ্ট

কাব্যকলি
  • ২০-১০-২০২৫

যেভাবে পৃথিবীতে এলো দুঃখ, কষ্ট
                                                                                    অলোক আচার্য 

মিথ হলো কোনো দেশের প্রচলিত এবং জনপ্রিয় লোককাহিনী যা মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এমনকি দেশের বাইরেও অনেক মিথ মানুষ শুনতে এবং পড়তে পছন্দ করে। গ্রিক শব্দ ‘মিথস্’ থেকে ‘মিথ’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ গল্প, কিংবদন্তি। অন্যদিকে ল্যাটিন ভাষায় ‘মিথস্’ শব্দটির অর্থ হলো নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিমÐলে বিদ্যমান অতিমানবীয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস। কারও মতে, গ্রিক ‘মুথোস’ শব্দ থেকে এসেছে ল্যাটিন মিথুস শব্দ। পৃথিবীতে যত দেশের মিথ প্রচলিত রয়েছে তার মধ্যে গ্রীসের মিথ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। গ্রীক দেবী দেবীর পৌরাণিক কাহিনীতে ঠাসা সেসব কাহিনী এক নিঃশ্বাসে শেষ করা যায়। এর মধ্যে একটি খুব প্রচলিত কাহিনী হলো প্যান্ডোরার বাক্স যা ইংরেজিতে প্যান্ডোরাস বক্স নামে পরিচিত। প্যান্ডোরার বাক্স সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে প্যান্ডোরা সম্পর্কে।  প্যান্ডোরার গ্রিক অর্থ হচ্ছে ‘যিনি সব উপহার বহন করেন’। গ্রিক পুরাণ মতে, প্যান্ডোরা হলেন পৃথিবীর প্রথম নারী। এই ঘটনার পেছনে রয়েছে এক লম্বা কাহিনী। অলিম্পাসের দেবতারা টাইটানদের কাছ থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেওয়ার কিছুকাল পর পৃথিবীকে নতুন করে সাজিয়ে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করার কথা ভাবেন। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় এপিমিথিউস ও প্রমিথিউসের উপর। এরা দু’জনে ভাই। এদের মধ্যে এপিমিথিউস পৃথিবীতে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করেন এবং তাদের ভালো গুণ উপহার দেন। অন্যদিকে প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে তুলে দেন মানবজাতির হাতে। আগুন চুরি করায় দেবরাজ জিউস প্রমিথিউসের ওপর রেগে যান এবং তাকে একটি পর্বতের গায়ে অনন্তকালের জন্য বন্দি করে রাখেন। জিউস ভেবেছিলেন মানবজাতি আগুন পেলে তা খারাপ কাজে ব্যবহার করবে। এ কারণে মানবজাতিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সুকৌশলী জিউস অগ্নি দেবতা হিফিস্টাসকে নির্দেশ দেন এক নারীকে সৃষ্টি করার। দেবতা হারমিস সেই নারীর নাম রাখেন প্যান্ডোরা। বহু দেব-দেবীর আশীর্বাদ পেল স্বর্গীয় বালিকা প্যান্ডোরা। দেবরাজ জিউস প্যান্ডোরাকে দুটি বিশেষ উপহার দেন। একটি হলো-প্রচÐ অনুসন্ধিৎসু মন আর সুসজ্জিত একটি আকর্ষণীয় বাক্স। বাক্সটি ছিল প্রচÐ ভারী এবং খুব শক্তভাবে আটকানো। বাক্সটি দেবার সময় জিউস প্যান্ডোরাকে সাবধান করে দেন-বাক্সের ভেতরে যা রয়েছে তা কোনো মরণশীল মানুষের জন্য নয়। কোনোভাবেই যেন বাক্সটি খোলা না হয়। জিউস প্রমিথিউসকে শাস্তি দেওয়াতে ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এপিমিথিউস শোকে কাতর হয়ে পড়েন। 
এ কারণে প্যান্ডোরাকে দেবতাদের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয় এপিমিথিউসের কাছে। প্রমিথিউস আগেই তাঁর ভাইকে দেবতাদের কোনো উপহার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু প্যান্ডোরাকে দেখামাত্রই প্রেমে পড়ে যান এপিমিথিউস। দু’জনে প্রেমের খেলায় মশগুল হয়ে ওঠেন। পৃথিবীর সাধারণ মানুষের মত প্যান্ডোরার মনেও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। কেন জিউস বাক্সটি খুলতে নিষেধ করেছেন? কি এমন আছে সেই বাক্সে? এক সময় প্যান্ডোরা অধৈর্য হয়ে ওঠেন। এভাবে অতিবাহিত হয় বেশ কিছুকাল। সময় যত যায় প্যান্ডোরার ধৈর্য ততই কমতে থাকে। একদিন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে এপিমিথিউসের চোখ এড়িয়ে বাক্সটি খুলতে খুলতে প্যান্ডোরা ভাবতে লাগল কী আছে একবার দেখেই আজীবনের জন্য সেটি বন্ধ করে দেবে। মূলত দেবতারাজ জিউস মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যত রোগ, জরা, হিংসা, দ্বেষ, লোভ, মিথ্যা ইত্যাদি সৃষ্টি করেছিলেন, সেইসব জমা করে রেখেছিলেন প্যান্ডোরাকে উপহার দেওয়া বাক্সে। বাক্সটি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সব পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। প্রচÐ ভয় পেলেও প্রাণপণ চেষ্টা করে সেগুলোকে আবার বাক্সের ভেতরে আটকে ফেলতে চাইল সে। কিন্তু ততক্ষণে অশুভ শক্তিগুলো ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। প্যান্ডোরা যখন নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছিল তখন হঠাত্ বাক্স থেকে স্বর্গীয় এক সংগীত শুনতে পায়। বাক্সটি আবার খুলতেই স্বর্গের উজ্জ্বল আলোতে চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আর প্যান্ডোরার দুঃখ-কষ্টও অনেকটা কমে যায়। প্যান্ডোরা বুঝতে পারে, সব অশুভ শক্তি আর দুঃখ-দুর্দশা তার মাধ্যমেই পৃথিবীতে আনতে চেয়েছিলেন দেবতা জিউস। পৃথিবীতে এর আগে রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি ছিল না। কিন্তু প্যান্ডোরার এই ঘটনার পর থেকে পৃথিবীতে মানুষ আক্রান্ত হলো রোগ, শোক, জরা, ব্যাধিতে। আজও মানুষ সেই ফল ভোগ করছে। তারপর থেকেই প্যান্ডোরাও মানুষের মুখে মুখে রয়ে গেছে। 

অ আ

শেয়ার করুন:
কাব্যকলি

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...