গল্প

নিমগ্ন চেতনার গল্পরা

  • ১৫-১০-২০২৫

নিমগ্ন চেতনার গল্পরা

শীতের দুপুরে তখনও রোদের দেখা নাই। কুয়াশামুখর হয়ে আছে সমস্ত বিহাস, আমগাছের ঘন পাতা, ইলেকট্রিক পোল, বাড়ির ঘুলঘুলির ফাঁকে ফাঁকে কুয়াশা মাকড়শার জালের মত লেগে আছে।

সৈকত আরেফিন

শীতের দুপুরে তখনও রোদের দেখা নাই। কুয়াশামুখর হয়ে আছে সমস্ত বিহাস, আমগাছের ঘন পাতা, ইলেকট্রিক পোল, বাড়ির ঘুলঘুলির ফাঁকে ফাঁকে কুয়াশা মাকড়শার জালের মত লেগে আছে।

নারকেলের পাতায় জমে থাকা কুয়াশা টুপটুপ করে পড়ছে বৃষ্টির মতো। তখন উজানে, হাসান আজিজুল হকের বাড়ির নিচতলার ঘরে রুমহিটারের উষ্ণতায় আমরা কজন হাসানের কথার জালে বন্দী— ‘যখন “শকুন” লিখি বুঝেছো, এমনি এমনিই লিখেছি, তখনও কিছু পড়িনি বলতে গেলে। যেমন দেখেছি লিখেছি। বিষয় নিয়ে ভাবিনি, ভাষা নিয়েও ভাবিনি। ’  সেই শীতদুপুরে কুয়াশাপ্রবণ আবহাওয়ায় তিনি তাঁর গল্প নিয়ে কথা বলছিলেন— ‘অভিজ্ঞতার বাইরে প্রায় লিখিনি আমি। কল্পনার আশ্রয় যে নিই নি, তা নয়; তবে তা প্রায় অনুল্লেখ্য। ’ তিনি সেদিন প্রতিভাকে অস্বীকার করে তাঁর লেখালেখির জন্য চারপাশকে চেনার কথা বলেছিলেন। সপ্তাহখানেক পরের একটি জবুথবু শীতরাতে সোলায়মান সুমনের গল্পপাণ্ডুলিপি ছায়াগুলো জেগে থাকে নিয়ে লিখতে বসে যখন শীতে হাত কাঁপছে তখন হাসানের কথায় ফিরে যেতে যেতে মনে হলো আমার কোনো রুমহিটার নেই। গল্পকার সোলায়মান সুমনের সঙ্গে দেখা হলে তাকে বলব ‘নদীর ঘ্রাণ মুছে উড়ে যায় সুবর্ণ চিল’ নামে সফিক আর এরিনার দীর্ঘকাঙ্ক্ষিত ফ্রিজ কেনার গল্প লিখলেই হবে না, রাজশাহীর শীত তো আপনি জানেন, একটি রুমহিটার না থাকাও কিন্তু কম দুঃখ না। আমি জানি, সুমন আমার কথাটি মাথায় রাখবেন। কারণ এই পাণ্ডুলিপি, যেটি দাবি করে প্রগাঢ় মনোযোগ, স্বীকার করতে হবে আমি মন নয়, পাণ্ডুলিপি জুড়ে চোখ বুলিয়ে গেছি মাত্র। এই ভ্রান্তি অপনোদনযোগ্য না হলেও বুঝেছি, এমন বিষয়কে সুমন গল্পে আনেন, যা অন্তত আমি কখনও ভাবিনি। অভাবিত এমন কী নেই তার গল্পে!

‘দানব’ বলে একটি গল্পের চরিত্র আব্বাস, যার রিরংসায় আক্রান্ত হতে চায় মৃতা যুবতী কমলার শরীর। কোনো এক হুজুরের তালবেলেম আব্বাস দাড়ি খিলাল করতে করতে কমলার শরীর কল্পনা করে। তখন কমলা মরে গেছে। আব্বাস অচরিতার্থ রিরংসার পীড়নে কবর খুঁড়ে কমলার শরীর পেতে চায়। এরকম ভয়াবহ কামগৃধ্‌নু মানুষকে গল্পে দেখে যুগপৎ ভয় ও বিস্ময়ে আমি শিউরে উঠেছি। আমার এ বিস্ময়-বিহ্বলতা আমি জানি, বালকসুলভ। অথচ মনে রাখতে হবে সুমন এ গল্প লিখেছেন তখন, যখন তিনি গল্প লিখতে প্রায় শুরু করেছেন, ২০০২ খ্রিস্টাব্দে। ছায়াগুলো জেগে থাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই অবলীলায় হাসান আজিজুল হকের কথা মনে পড়েছিল। হাসান বলেন একজন কথাসাহিত্যিক মিথ্যে বলতে পারেন না। তাঁর সাহিত্যে গল্প উপন্যাসে সত্যটাই উচ্চারিত হয়। সুমনের পাণ্ডুলিপির এগারোটা গল্প পড়ে আমার মনে হলো, হাসান হয়তো ঠিকই বলেছেন। শিল্পী হবার জন্য অভিজ্ঞতা থাকতেই হয়। সুমনের ভূগোল ও পরিভ্রমণের খতিয়ান আমি অনুমান করতে পারি। এবং দৃশ্যত পাণ্ডুলিপিটি আমার অনুমানকে অনুসরণ করে। সীমান্তজেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ সুমন মহানন্দার জলে স্নাত হয়ে একদিন রাজশাহী নগরে পদ্মার চরে হেঁটে বেড়ান। তারপর তাকে পাওয়া যায় ঢাকা মহানগরে, গোড়ানে। গোড়ানের সেই দালান বাড়িটায়, যার মালিক কানাডাপ্রবাসী আর বেকার যুবক মাজেদ যার হর্তাকর্তা। ছায়াগুলো জেগে থাকে পাণ্ডুলিপির প্রথম গল্প ‘একটি অপমৃত্যুর অন্তর্কথন’ সুমন নির্মাণ করেন কুত্তার ঘেউঘেউয়ে অতীষ্ট চাকরি না পাওয়া এই মাজেদের অন্তর্চিত্রণে। মেস তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব যে মাজেদকে উল্লম্ফিত করেছে, মেস মেম্বাররা মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করে মাজেদের উপরি ইনকামের ব্যবস্থা করে এমনকি মাজেদ রাস্তার কুকুরের চিৎকারে বিপর্যস্ত হয়, বিষমেশানো মাংস দিয়ে কুকুর হত্যার আয়োজন করে, এই বিষ-মাংসে কুকুর মারা যায়নি, মরেছে ছাটাই হওয়া বস্ত্রবালিকা শেফালি তার দুটো বাচ্চাকে নিয়ে— তবু শেষপর্যন্ত মাজেদের মধ্যেও মানুষ-সত্তাটি যে মরে যায় নি তারই একটি ভাষাচিত্র হয়ে ওঠে সুমনের পাণ্ডুলিপির এই গল্পটি ‘একটি অপমৃত্যুর অন্তর্কথন’।

এরপর অনুমান করা যায় গল্পকার সুমন ঢাকা নগরে ব্রাত্য এক পর্যটকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পুরনো ঢাকার অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে নিশ্চিতভাবেই তার সঙ্গে দেখা হয় ঢাকা নগর থেকে ক্রমে বিলীয়মান কোনো এক টাঙাঅলার সাথে। সেই টাঙাঅলার নাম হতে পারে ইব্রাহিম, তার ছেলেটির নাম ইসমাইল; সুমন এই নামের রিলিজিয়ন হিস্ট্রি জানেন বলে তিনি আকৃষ্ট হন এবং টাঙাঅলা ইব্রাহিমকে নিয়ে লিখে ফেলেন গল্প— ‘টাঙাঅলা ও তার অন্ধকার। ’ শুধু বিলীয়মান টাঙার ঐতিহাসিক বাস্তবতাই নয়, এই গল্পে অবলীলায় অনুপ্রবিষ্ট হয় একদিকে যেমন সম্রাট বাহাদুর শাহ অন্যদিকে ইংলিশ রোডের লীলাবতী রতিমতি যুবতীও। কিন্তু শেষপর্যন্ত এ গল্পে, টাঙাঅলা তার অস্তিত্ব-নাশের সংবাদ দিলেও ইতিহাসও যে গল্পটির একটা অনুষঙ্গ হতে পারতো, সুমন সেদিকে আর বেশি যত্নবান হন না। এভাবে পরিভ্রমণে গল্পকার সোলায়মান সুমন কখনো কখনো ঢাকা নগরের ক্লিন্নতায় অস্বস্তিবোধ করেন। ফিরতে চান সবুজ নৈসর্গে, গ্রামে— মহানন্দার টলমল জলে একদিন স্নান করে ক্লেদমুক্ত হতে চান। সত্যি তিনি ফেরেন। ফিরে, মহানন্দা তাকে মুক্তি দেয় বটে, কিন্তু সুমন জানেন তিনি গল্পকার। তিনি ছুটে যান বর্ডারে, যেখানে বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া ঢুকে গরু চুরি করে এনে ভাদুমিয়ার চায়ের স্টলে চা খায় গোপ্পিবাজ ফেকু। শীতদুপুরআড্ডায় হাসান আজিজুল হক যেমন বলেছিলেন— ‘কল্পনার আশ্রয় যে নিইনি, তা নয়; তবে তা প্রায় অনুল্লেখ্য’ সম্ভবত সুমনও গল্পটিতে তার অভিজ্ঞতার বাইরে অংশত কল্পনার আশ্রয় নেন। গরুচোর ফেকু হারু চোরের কুড়িয়ে পাওয়া পালিত-পুত্র হতে পারে। কিন্তু গরুর মালকিনকে হত্যা করে গরু চুরি করার পর সেটিকে ফিরিয়ে দেবার গল্প ‘প্রত্যাবর্তন’-এ সুমন সম্ভবত তার প্রবণতাসমেত কল্পনা নিয়ে হাজির হন। কারণ এই যে, নষ্ট হতে হতে মানুষই তো ফিরে আসে। একজন কথাকার হিসেবে সুমন নিশ্চয় মানুষের মধ্যে মানুষ-সত্তার এই উদ্বোধনই চান, যেমনটা ‘দানব’ ও ‘একটি অপমৃত্যুর অন্তর্কথন’-ও আমরা দেখি। অবশ্য জীবন সবসময় একরকম হয় না। ‘সীতার বনবাস’-এর ট্রাক ড্রাইভার আজমলের কোনো রূপান্তর হয় না। যৌনকর্মী হিরাকে আজমল বিয়ের নামে যথেচ্ছা ব্যবহার করে বটে, তবে সে শেষপর্যন্ত একজন প্রতারকই থেকে যায়। হিরার অন্তর্লীন প্রেমও তাকে ফেরাতে পারে না। আজমল তার সমস্ত মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে ফিরে যায়। ‘আজমলের চলে যাওয়ার পথের দিকে হিরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের কোণে এক জোড়া অশ্রু বিন্দু পাথরের মতো জমে যায়। চোখ দুটো তার জলে ঝাপসা হতে হতে এক সময় আজমল ড্রাইভার অদৃশ্য হয়ে সীতা দেবীর সুন্দর মুখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে দেখে সীতার পায়ের নিচের মাটি ফেটে দুদিকে সরে যাচ্ছে। আর সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে সীতা তলিয়ে যাচ্ছে মাটির অন্ধকার অতল গভীরে। ’

‘পণ্য’ নামের গল্পটিতে সোলায়মান সুমন অবক্ষয়িত মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনদিকটা আমাদের সামনে অবমোচন করেন। হারুন ও রোকসানার অধঃপতন ও বিপর্যয়ের এই গল্প পড়ে মুষড়ে পড়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমরা জানি জীবন গল্পের চেয়েও অশ্লীল। জীবনের এই অসহনীয় বাস্তবতাকে তো গল্পকার উপেক্ষা করতে পারেন না। সুমন এভাবেই গল্প লেখেন। জাফর তালুকদার যেমনটা বলেন—  ‘এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর আমাকে টেনে নেয় সুমনের গল্প— যা ঠিক প্রচলিত ধারার নয়, পাঁচে পাঁচে দশ হবে তাও বলা যাবে না। অঙ্কের পুরনো পাঠের নিয়মে, ওঁর গল্প একের ভিতর বহু, একটি মুখের ভেতর অনেকগুলো মুখ, একটি চোখের ভেতর মাছির মতো ঘুরে বেড়ায় অসংখ্য চোখ— কখনও তাঁর কাহিনী এগোয় সমান্তরাল ভঙ্গিতে, কখনও এবড়ো-থেবড়ো একেবারে রুক্ষ প্রান্তর যেন বা— ঠিক ছকে মেলে না, মেলানো যায় না প্রচলিত জীবনের হিসেব নিকেশও; তাঁর চরিত্ররা বহুমাত্রিক, ভাঙাচোরা, জটিল পোকাকাটা, কখনও আবার চোখ-ধাঁধানো, কিংবা নুয়ে পড়া, ধূসর ও উচ্ছ্বলতার পরাগরেনু মেখে তারা ঘুরে বেড়ায়, হামা দেয়, অট্টহাস্য করে, অশ্রু ফেলে— এভাবে নানা কৌণিক বিণ্যাসে তারা দাঁড়ায়, আলো ফেলে, ম থেকে নেমে আবার মিশে যায় অন্ধকারে। এই মানুষগুলো এভাবে ফিরে ফিরে আসে তাঁর গল্পে। ’ আরও গল্প আছে পাণ্ডুলিপিটিতে। কিন্তু সুমন যে ছায়াগুলোর জেগে থাকার আকাঙ্ক্ষা করেন সেই ছায়া সবসময় জেগে থাকে না। ছায়া যদি মানুষের অন্তর্গত বিবেক হয়, কোথায় তা? সুমন জানেন, হয়তো গভীরগোপনসত্তায় মানুষ একেবারে বিবেকবর্জিত হয় না। কিন্তু তাকে জেগে থাকা বলে না। নিভৃতে থাকার নাম গা বাঁচিয়ে থাকা। চরিত্রবান থাকার নাম হয়তো সুযোগের অভাব। গল্পের জন্য কাহিনী-চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে লেখককে দৃশ্যমান জগতকে পরিবর্তন করে নেন। সব লেখকই, এমনকি রবীন্দ্রনাথও কাহিনী বলবার জন্য চরিত্র বানিয়েছেন। এবং বলতে গিয়ে বলে ফেলেছেন সমাজের, মানুষের আসল সত্যটাই। সুমনও পেরেছেন। মুখ ও মুখোশসমেত মানুষকে উন্মোচন করতে চেয়ে আমাদের যা চাক্ষুষ করিয়েছেন কখনো আমরা স্তম্ভিত হয়েছি, কখনো মুষড়ে গেছি, কখনো আশান্বিত হয়েছি, কখনো বেদনার্ত হয়েছি। কিন্তু যে ছায়ার জেগে থাকার প্রয়োজন মনে করেছেন সুমন, সে ছায়াটি অপসৃয়মাণ। তবে সুমনের আকাঙ্ক্ষা যে আলোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, আমরা ইঙ্গিতটুকু পেয়েই আর তৃপ্ত হতে চাই না। আমরা উদ্বোধন চাই সত্যের, দৃঢ় অভিব্যক্তির— নিজের মধ্যে; সুযোগের অভাবে আমরা চরিত্রবান হয়ে উঠতে চাই না। সুযোগ পেয়েও যেন অমানবিক সত্তাকে পেছনে ঠেলতে পারি। যেন নিভৃতে গা বাঁচিয়ে না চলে সামনে এসে দাঁড়াতে পারি। আর তখনই আমরা বলতে পারবো— ছায়াগুলো জেগে আছে। গভীরগোপনসত্তা থেকে আমরা আকাঙ্ক্ষা করি— ছায়াগুলো জেগে থাক।
শেয়ার করুন:

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...