রেজাউল করিম মন্টু সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়—ছেঁড়া ছেঁড়া গল্পের মতো; আর যা কিছু জানা যায় না, পরিচিতদের মধ্যে যারা যুবকের সঙ্গে ঘনিষ্টতার দাবি করে তাদের কেউ কেউ হয়তো একদিন নাসিরের চা-স্টলে চা খেতে বসে বেনসন অ্যান্ড হেজেজের মাথায় আগুন লাগিয়ে বাতাসে ধোঁয়ার রিং বানাতে বানাতে চারুনিশি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
—চারু আপা সম্পর্কে বলেন না মন্টু ভাই! কে বেশি ভালোবাসতেন? আপনি চারু আপাকে নাকি চারু আপা আপনাকে?
তাদের টলমল আগ্রহে জল ঢেলে এমনকি প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গতিহীনভাবে যুবক অনতিস্বরে বলে—হয়তো। এমন নিরুত্তাপ, কর্কশ ও অপ্রাসঙ্গিক ‘হয়তো’-র কনফিউশন সত্ত্বেও তারা আগ্রহ হারায় না। চারুনিশি কেমন দেখতে ছিল সে সম্পর্কে শহরের লোকেরা নানারকম বর্ণনা দেয়। কেউ বলে সে ছিল একটি দেশি লালঝুটি মোরগের মতো দুরন্ত, কেউ তাকে একটি গোলাপ ফুলের ফুটে ওঠা পাপড়ির উপমায় চেনাতে চায়। যুবকের পরিচিত নিকটজনেরা যারা বাস্তবে চারুকে কখনো দেখে নাই, তারা এই লালঝুটি মোরগ অথবা গোলাপ ফুলের পাপড়ির সঙ্গে একটি মেয়ের চেহারার বর্ণনায় সন্তুষ্ট হয় না। তবে এ বিষয়ে তাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না যে, মন্টু ভাই চারুকে খুব ভালোবাসতেন, চারুনিশি তো বটেই। ফলে যুবক শুধু হয়তো বলে তাদের প্রথম প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও তারা হতাশ না হয়ে বেনসন অ্যান্ড হেজেজে টান দিতে দিতে দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়—
—মন্টু ভাই, চারু আপার কোনো ফোটোগ্রাফ নেই আপনার কাছে? দেখান না আমাদের! শুনেছি খুব সুন্দরী ছিলেন!
আগের প্রশ্নের উত্তরে যুবক একটি শব্দ অন্তত বলে, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নে কোনো কথা না বলেই রেজাউল করিম মন্টু উঠে চলে যায়। পরিচিত লোকেরা নিরাশ-চোখে যুবকের চলে যাওয়া দেখে। বহু বছরের পুরনো যুবক-যুবতীর অপ্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতার কারণ ও যুবতীর মুখাবয়ব উদ্ঘাটনের একটি বাস্তব-সম্ভাবনা কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
শহরের লোকেরা বলে—চারুনিশি, বাবুই পাখির মতো মেয়েটি, মনোটোনাস এই শহরটিকে বাসযোগ্য করে তোলে। মফস্বল শহরের নিস্তরঙ্গ উদাসীনতা এক পশলা বৃষ্টি যেভাবে উচ্ছল উচ্ছ্বাসে দিগ্বিদিক করে দেয়, চারু ছিল এই শহরে সেরকম মুষলধারা বৃষ্টি। মেয়েটি এমনভাবে কথা বলে যেন শান্ত পুকুরে একটা ঢিল পড়ে চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে যায়। তার কথায় বাতাসে পারফ্যুমের মতো মিশে যায় আনন্দ আর স্বস্তি। কথা বলতে বলতে তার চোখের পাতা নুয়ে পড়ে আবার দুলে ওঠে লজ্জাবতী পাতার মতো। শহরের গা ধরে বয়ে যাওয়া প্রাচীন নদীটির জল ছুঁয়ে সে হাঁটে। জলে এমনভাবে পা ফেলে যেন একটি পাতায় জমা হওয়া শিশিরবিন্দু মুক্তোর মতো গড়িয়ে পড়ে আরেকটি পাতায়।
ছেঁড়া ছেঁড়া ধোঁয়াশার মতো দিনযাপনের পরতে পরতে মুখর একেকটি সকাল, দুপুর, বিকেল। তখন একদিন নদীর ওপর একটি পানসি ভাসিয়ে দূরে কোথাও নয়, কেবল নদীটির বুকের মধ্যে জেগে ওঠা চরে কাশবনে হাঁটতে হাঁটতে দুপুরের রোদ গায়ে মেখে তরুণ আর তরুণী মাথার ওপর দিয়ে কয়েকটি বালিহাঁস উড়ে যেতে দেখে। চারুনিশি সেই উড়ে চলা বালিহাঁস দেখে বিমূঢ় বিস্ময়ে রেজাউল করিম মন্টুর দিকে তাকায়।
—এই মন্টু, বালিহাঁস উড়তে পারে!
যুবক তখন মেয়েটির বিস্মিত চোখে চোখ রেখে টের পায় পবিত্র শিশুর সারল্যে ভরপুর এই চোখ কী ভীষণ সুন্দর! দুজনের সেই তাকিয়ে দেখার মুহূর্তটি হয়তো তাদের পরবর্তী জীবনের নিয়তি নির্ধারণ করে দিতে পারতো। তা হয় না, বরং তার পরের মুহূর্তগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি নিয়ে অপেক্ষা করে। বালিহাঁসের ঝাঁক উড়ে যায় ঠিকই। কিন্তু কাশবনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে একদল দাঁতাল শুয়োর। না, তারা দেখতে অবশ্য শুয়োরের মতো নয়। তবে যুবকটিকে মুহূর্তে বেঁধে ফেলে একদল শুয়োরের মতোই তারা হামলে পড়ে যুবতীর ওপর। তখন পদ্মাপাড়ে সূর্য ডুবে যেতে থাকে, কাশবনের ভেতরে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে শিশিরপাতের মতো নিঃশব্দে অন্ধকার ঘন হয়ে আসে।