রেদওয়ান শরীফ
সবে মাত্র এইচএসসি শেষ করে কলেজে পা দিয়েছে রাকিন। একমাস হয়ে এসেছে তার
এই
ক্যাম্পাসে অথচ এখন পযন্ত একটাও বন্ধু যটেনি। পুরো ক্লাস রুমে একা একা ক্লাস করে, চুপচাপ। কারো সাথে কোন কথা নেই। কথা নেই বললে ভুল হবে, কথা বলার মানুষ নেই। কারণ এই বিশাল ক্লাসরুমে একটাও বন্ধু নেই তার। তাই
স্যারের পরার মাঝে মাঝে অযথা দুয়েকটা প্রশ্ন করে পুরো ক্লাস রুমটাকে জানান দিতে
চায় সে ভালো। পড়ালেখায় মনোযোগী। কারণ ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে ভালো ছাত্রদের
বন্ধুর অভাব হয় না। সকালে স্কুলে আসার পর থেকে বিকেলে বাড়ি যাওয়া অব্দি প্রতিটা
সময়ই পাশে বন্ধু থাকে একটা, সবসময় ।কিন্তু তাতেও কোন লাভ
হয় না। পলক ফেলে একবারও কেউ তাকায় না তার দিকে। নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে সবাই। এমনকি
তার পাশের বেঞ্চটা ও সবসময় খালি থাকে । তার এই অযোক্তিক
প্রশ্নের কারণে স্যারের গুরুত্বপূর্ণ সময় বৃথা যায় শুধু শুধু। তাই ক্লাস শেষ হওয়ার
সাথে সাথে রাকিন ক্লাস রুমের করিডোর ধরে হাটতে থাকে, নির্বিকার
ভঙ্গীতে । পুরো ক্লাস রুমটায় সবার বন্ধু আছে, কিন্তু তার
নেই। সে এক। কেউ এসে বন্ধুত্ব করতে চায় না তার সাথে। মাথে মধ্যে মনে হয় তার এই কুৎসিত চেহারাটাই বোধয় এর উৎস। কিন্তু তার চেহারা তো ভালোই। দেখতে শ্যামলা, চোখ দুটো বড় বড়। পাতলা
চুলগুলো এসে পরে থাকে কপালে। কিন্তু এতে বিন্দু মাত্র খারাপ দেখায় না তাকে। গালে
কয়েকটা খোঁচা দাড়িও আছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়..? তার
ব্যবহারে..?
কিন্তু
সে তো কারো সাথে খারাপ ব্যাবহার করে না, তাহলে...
ঢাকার নামকরা একটি প্রাইভেট কলেজে পড়ে রাকিন।কঠোর নিয়ম চলে এই ক্যাম্পাসটায়। বিশেষ করে এসাইনমেন্ট এর অসহ্য যন্ত্রণার তো কোন কথাই নাই।প্রতি সপ্তায় বাড়ি ফেরার সময় এক গাট্ঠী লিখা দিয়ে দেয় সাথে। সারারাত বসে সে সব লিখা লিখতে হয় তার। এর জন্য চোখের নিচে কালিও জমেছে অল্প।
একদিন ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় রাকিন স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের কথা ভাবছিল। কত সুন্দর সময় কাটিয়েছিল ক্লাস নাইন টেন টায়। জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয় সে সময়টায় শিখেছিল সে। বন্ধুদের সাথে ক্লাস বাক মেরে ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে দু'তিন কিলোমিটার হেটে হেটে পথ পারি দেওয়ার পর ফাকা পকেট নিয়ে বাড়ি ফেরার চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকা। হয়তো কোন ট্রাক কিংবা বড় কোন গাড়ির পেছনে ঝুলে ঝুলে চলে আসত বিনা পয়সায়। কথা ছিল এই বন্ধুত্বের সুন্দর সময়গুলো আজীবন ধরে রাখার জন্য একই কলেজে ভর্তি হবে, সবাই। কিন্তু রেজাল্ট আসার পর পর সবাই ভিন্ন হয়ে যায়। যে যার যার পথে। দেখা হয় না কারো সাথে কারো আর। সবাই আলাদা...
এখানে এসে সবার সাথে বন্ধুত্ব করতে ভয় হয় রাকিনের। মনে হয় যেন তার বন্ধুদের সুন্দর জায়গাগুলো অন্য কাউকে দিয়ে দিচ্ছে। সুন্দর সময় গুলো বিক্রি করে ফেলছে অন্য কারো কাছে। কিন্তু এই স্মৃতির তো কোন মূল্য নেই। এই স্মৃতির মূল্য কি দেওয়া যায়। এই স্মৃতির মূল্য কি আর দিতে পারে এইসব মানুষ..?
কিন্তু বাস্তবতা তো আর এসব মানে না। বাস্তবতা খুব কঠিন। চাইলেই কি একা থেকে জীবন পার করে দেয়া যায়..? একাকীত্ব এতটাই সহজ!
এসব কথা ভেবে বন্ধুত্ব করার জন্য রাকিন অনেকের কাছেই গিয়েছে। কথা বলেছে। অহেতুক সব কথাবার্তায় হেসেছে। কিন্ত তাতেও কোন লাভ হয়নি। কোথায় যেন কিছু একটা বেধে যায় মনের ভেতের। আর হয়ে ওঠে না। দিনশেষে একাই রয়ে যায় সে..
ক্যাম্পাসের পাঁচ তলার করিডোর এর গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে রাকিন। বুক ফেটে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। সবাই কত সুন্দর একে অপরের কাধে হাত রেখে হেটে বেরাচ্ছে। খুশি হয়ে গালাগাল দিচ্ছে। এর প্রতিত্তোরে আরেকটা গাল দিচ্ছে। আহ! কি সুন্দর। কিন্তু তার তো সেটা নেই। এরকম একটা বন্ধু নেই যে প্রাণ খুলে গালি দিবে । আবার হাটার সময় কাধে হাত রেখে চলবে। চিৎকার করে পুরো ক্যাম্পাসটাকে ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে রাকিনের। এভাবে কি আর চলা যায়। এভাবে চলা কি আদৌ সম্ভব। একাকীত্ব মানেই কি মৃত্যু নয়..?
গ্রিলে হাত রেখে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাকিন। মনে মনে ভাবছে এখান থেকে লাফ দিলে সে মরবে..? একাকীত্ব থেকে পালাতে পারবে..?
লাফ
দিয়ে পারার সময় আব্দুল্লাহ আল মামুনের একটা লিখা পড়লে কেমন হয়...?
" আমি চলে গিয়ে দেখেছি, চলে যাওয়া যায়,
কিন্তু
থাকতে চেয়ে দেখেছি থাকা যায় না।
আমি মরতে গিয়ে দেখেছি, মরে যাওয়া যায়
কিন্তু
থাকতে চেয়ে দেখেছি কেউ রাখতে চায় না।"