• September 16, 2026
গল্প

মা অথবা উৎসর্গের গল্প

সম্পাদক
  • ২৪-০৮-২০২৬

মা অথবা উৎসর্গের গল্প

মাতৃত্ব সুন্দর, কিন্তু কোনো নারীর জীবন তার বিনিময় হতে পারে না। একজন নারীর জীবনও মূল্যবান। তার শরীরের সিদ্ধান্তে তার নিজের মতামতের মূল্য আছে। সন্তান নেওয়া হবে কি না—এ সিদ্ধান্তে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন চিকিৎসকের পরামর্শ, পারস্পরিক সম্মতি এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই নারীর নিজের ইচ্ছার প্রতি সম্মান। কারণ একটি সন্তান পৃথিবীতে আসার আনন্দের চেয়ে একজন মায়ের জীবন কখনোই কম মূল্যবান নয়।

এটা কি জীবন?

সাফিয়া নূর মোকাররমা



স্কুল থেকে ফিরে সেদিন ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম। স্কুলের পোশাকটাও খুলিনি। সোজা এসে বসে পড়লাম খেতে। হাত ধোয়ার কথা তো দূরের বিষয়। দেখি, পাশের বাড়ির চাচি, ভাবি, আম্মু, খালাম্মারা সবাই গল্পে মেতে উঠেছেন।

আমি যে সকাল থেকে না খেয়ে স্কুল থেকে ফিরেছি, সেদিকে আম্মুর কোনো খেয়ালই নেই। মনে হচ্ছিল, দুই হাত দিয়ে খাই। দুই হাত দিয়ে খেলেও তো মুখ একটা—এতটাই খিদে পেয়েছিল।

আম্মুর রান্না করা শুঁটকি—এক কথায় অসাধারণ। তার ওপর শিমের বিচি দিয়ে রান্না। খাওয়া শেষ করে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আম্মুরা তখনও গল্প করছেন। আমার দিকে কারও নজর নেই।

রাগ করে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে আছি। অন্যদিন আম্মু বলে, “ফ্রিজে খাবার রেখে দিয়েছি, খেয়ে নিস।” আজ কেন বলছে না? থাক, আমি ঘুমাই।

কিন্তু তাঁদের চিৎকার করে গল্প বলায় ঘুম তো দূরের কথা, চোখই বন্ধ করা যাচ্ছিল না।

হঠাৎ শুনলাম, পাশের বাড়ির চাচি সিহামের জন্মের সময়ের প্রসবের গল্প করছেন। এরপর একসময় আমার মা বলতে শুরু করলেন, আমার জন্মের সময় তাঁর তিন দিনের প্রসববেদনার কথা।

আমি চুপিচুপি শুনছিলাম। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। অনেক কিছুই বুঝতে পারছিলাম।

সেদিন প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম—পৃথিবীর আলো দেখার জন্য আমি আমার মাকে কতটা কষ্টই না দিয়েছিলাম!

আম্মু নাকি দাদি ও আব্বুর কাছে মাফও চেয়ে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, এভাবে হয়তো আর বাঁচবেন না। আমি পৃথিবীতে আসার পর আমার নানু নাকি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,

“মোটা সোনা, তুমি আমার মেয়েকে এত কষ্ট দিলে!”

সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম, একটি সন্তান জন্ম দিতে একজন মাকে কতটা কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

মায়ের এই অসীম ত্যাগের কারণেই হয়তো মায়ের মর্যাদা এত বেশি। সন্তান জন্ম দেওয়া শুধু একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন নারীর শরীর, স্বপ্ন, ভয়, ভালোবাসা এবং অসীম সহ্যশক্তি।

সেই রাতেই যেন আমার মনে একটি গল্প জন্ম নিল—সাবিহার গল্প।

সাবিহার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু কয়েক নম্বরের জন্য মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না। তবু সে থেমে গেল না। সে ভর্তি হলো Bachelor of Physiotherapy-তে।

সাদা অ্যাপ্রন পরে মানুষের সেবা করতে তার ভীষণ ভালো লাগত। ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাত। সময়ের অভাব ছিল, তবু প্রতিদিন আট-নয় ঘণ্টা পড়াশোনা করত।

এর মধ্যেই পৃথিবীতে এলো COVID-19। সাবিহাও আক্রান্ত হলো। পরবর্তীতে সে দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সমস্যায় ভুগতে শুরু করল। তবু থেমে থাকেনি।

অবশেষে তার স্নাতক ডিগ্রি শেষ হলো।

গ্র্যাজুয়েশনের দিন কার্জন হলের সামনে দাঁড়িয়ে সাবিহা ফেসবুকে লিখেছিল—

“I am graduated.”

দুরন্ত, মেধাবী সাবিহার চাকরি হলো একটি করপোরেট হাসপাতালে। Consultant Physiotherapist হিসেবে ভালোই দিন কাটছিল। রোগী দেখত, মানুষকে সেবা দিত, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিল।

একসময় সাবিহা বিয়ের পিঁড়িতে বসল।

বিয়ের পর যেন তার জীবনে ধীরে ধীরে নেমে এলো এক অদৃশ্য চাপ।

পরিবারের কাজ সামলে হাসপাতালে ডিউটি করত। এর মধ্যেই তার ফুসফুসের সমস্যা বাড়তে লাগল। কিন্তু নতুন বিয়ে হওয়ায় নিজের শারীরিক কষ্টগুলো কারও সঙ্গে ঠিকভাবে শেয়ার করতে পারত না।

সারাদিন চাকরি, এরপর সংসারের কাজ—এভাবেই দিন কাটতে লাগল।

বিয়ের দুই বছর পর তার কাঁধে এলো সন্তান নেওয়ার চাপ।

কিন্তু তখন তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না।

গাইনি চিকিৎসক স্পষ্ট করে বললেন,

“আপনার জন্য গর্ভধারণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সন্তান নেওয়া উচিত হবে না।”

একজন নারীর জন্য এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে?

সাবিহা চিকিৎসকের পরামর্শ বারবার পড়ছিল।

তার মনে হচ্ছিল—

“আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এত দিনের স্বপ্ন—আমার একটা বাচ্চা হবে, তাকে ভালো স্কুলে পড়াব—এই স্বপ্ন কি অসুস্থতার কারণে আমার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল?”

না, সাবিহা সহজে ভেঙে পড়ল না।

সে আরেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিল। একদিকে রোগী দেখছে, সংসার সামলাচ্ছে; অন্যদিকে নিজের শরীরের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করছে।

কিন্তু তার শাশুড়ি ও স্বামী তখনও বলছেন,

“বাচ্চা নাও। আমাদেরও তো সন্তানের মুখ দেখার ইচ্ছা আছে।”

সাবিহা যেন আর আগের সাবিহা নেই।

এত কষ্ট করে পড়াশোনা, রোগী দেখা, নিজের পরিবার সামলানো—দিন শেষে নিজেকে মনে হতো ঢালহীন এক পাখির মতো।

তবু সে নিরাশ হয়নি।

বিয়ের চার বছর কেটে গেল।

একসময় স্বামী আর মানতে চাইল না।

সে বলল,

“বাচ্চা না নিলে তোমাকে রেখে আমি আবার বিয়ে করব।”

শাশুড়িও বললেন,

“তোমাকে আলমারিতে রাখার জন্য বউ করে আনিনি। নাতি-নাতনির মুখ দেখতে আমারও তো মন চায়।”

সেই রাতে সাবিহা তাহাজ্জুদের নামাজে অঝোরে কাঁদল।

সিজদায় গিয়ে অনেকক্ষণ নীরব রইল।

তারপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—

“আমার স্বামী, আমার শাশুড়ি, আমার পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোই আমার সুখ। আমি হয়তো ডাক্তারের কথামতো বাঁচব না। কিন্তু আমি সন্তান নিলে তারা সুখী হবে।”

সাবিহা যেহেতু Respiratory Physiotherapy Care Unit-এ কাজ করত, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সে ভালোভাবেই জানত।

সে জানত, গর্ভাবস্থায় তার শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে। জানত, তার হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। জানত, পরিস্থিতি খারাপ হলে তাকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টও নিতে হতে পারে।

তবু সে সিদ্ধান্ত নিল।

অবশেষে সাবিহা গর্ভবতী হলো।

চারদিকে আনন্দের আমেজ।

অন্যদিকে শুরু হলো সাবিহার হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা।

সে একা একা চিকিৎসকদের কাছে ছুটতে লাগল। কারণ সে জানত—চিকিৎসকদের আশঙ্কা সত্যি হলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তবু তার মনে একটি কথাই ছিল—

“আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু আমার একটি শেকড় পৃথিবীতে রেখে যাব।”

তার সমস্ত সঞ্চয় সে ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য রেখে দিতে শুরু করল।

গর্ভাবস্থার শেষদিকে সাবিহাকে ICU-তে নিতে হলো। একটি শ্বাস নেওয়াও তার জন্য আকাশসম কষ্ট হয়ে উঠল।

যে মেয়েটি এতদিন অন্য রোগীদের respiratory care দিত, একদিন তাকেই সেই একই সেবা নিতে হলো হাসপাতালের একটি বেডে।

চিকিৎসক, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট—সবাই যেন থমকে গেল।

একজন নারী পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একসময় সাবিহাকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে নিতে হলো। কথা বলার শক্তিও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলল সে।

ইশারায় কাছের মানুষদের ডাকল।

কাঁপা হাতে ইশারা করে বলল,

“আমার বাচ্চাটাকে তোমরা দেখো। তুমি ওকে ফিজিওথেরাপি দিও।”

হাসপাতালের সবাই তখন নীরব।

একজন মা তার সন্তানকে পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—নিজে হয়তো আর পৃথিবীতে থাকবেন না, সেটা জেনেই।

অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন—সন্তান জন্ম দেওয়ার দিন।

সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হলো।

হাসপাতালে আনন্দের আমেজ। মিষ্টি বিতরণ শুরু হলো। সবাই নতুন শিশুটিকে নিয়ে ব্যস্ত।

কিন্তু মাত্র আধা ঘণ্টা পর সাবিহার শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে গেল।

তারপর—

সাবিহা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।

একটি সন্তান পৃথিবীতে এলো।

আর একজন মা পৃথিবী থেকে চলে গেলেন।

আমি শুধু ভাবি—

এটা কি জীবন?

একজন নারী কি শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেবে?

একজন মায়ের স্বপ্ন, শরীর, ভয়, অসুস্থতা—এসবের কি কোনো মূল্য নেই?

সন্তান নেওয়া কি ভালোবাসার সিদ্ধান্ত, নাকি কখনো কখনো পরিবারের চাপের কাছে একজন নারীর আত্মসমর্পণ?

সেদিন আমার মায়ের প্রসববেদনার গল্প শুনে আমি বুঝেছিলাম—একজন মা সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে কতটা কষ্ট সহ্য করেন।

আর সাবিহার গল্প আমাকে শেখায়—

মাতৃত্ব সুন্দর, কিন্তু কোনো নারীর জীবন তার বিনিময় হতে পারে না।

একজন নারীর জীবনও মূল্যবান। তার শরীরের সিদ্ধান্তে তার নিজের মতামতের মূল্য আছে। সন্তান নেওয়া হবে কি না—এ সিদ্ধান্তে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন চিকিৎসকের পরামর্শ, পারস্পরিক সম্মতি এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই নারীর নিজের ইচ্ছার প্রতি সম্মান।

কারণ একটি সন্তান পৃথিবীতে আসার আনন্দের চেয়ে একজন মায়ের জীবন কখনোই কম মূল্যবান নয়।

এটাই কি আমাদের ভাবার সময় নয়?



 

লেখক- ঢাবি মেডিসিন অনুষদ ফিজিওথেরিপি ডিপার্টমেন্টে অধ্যয়নরত

 


শেয়ার করুন:
সম্পাদক

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...