• September 17, 2026
গদ্য

বই পাগল নজরুল ইসলাম

  • ১৫-১০-২০২৫

বই পাগল নজরুল ইসলাম

নজরুল ইসলামের বয়স ৭০। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। হালকা গড়নের শরীরটি যে র্দূবল তা দেখেই বোঝা যায়, কিন্তু শারিরীক দুর্বলতা ও বয়স তার ইচ্ছাশক্তিকে দমন করতে পারেনি। এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত উত্তরণ লাইব্রেরীতে রাত্রী যাপন করে মূল্যবান বইগুলো পাহারা দিয়ে থাকেন। আর এ কাজটি তিনি করে চলেছেন আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে।

আলাউল হোসেন

নজরুল ইসলামের বয়স ৭০। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। হালকা গড়নের শরীরটি যে র্দূবল তা দেখেই বোঝা যায়, কিন্তু শারিরীক দুর্বলতা ও বয়স তার ইচ্ছাশক্তিকে দমন করতে পারেনি। এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত উত্তরণ লাইব্রেরীতে রাত্রী যাপন করে মূল্যবান বইগুলো পাহারা দিয়ে থাকেন। আর এ কাজটি তিনি করে চলেছেন আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে।

পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের বই পাগল এই মানুষের পুরো নাম এম. এল. নজরুল ইসলাম। শৈশব থেকেই বই পড়ার পোকা ছিলেন তিনি। ঢাকায় সরকারি বাংলা কলেজে পড়াকালীন সময়ে তার সুযোগ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী দীন মোহাম্মদ প্রিন্সিপ্যাল, ইব্রাহিম খাঁ, লেখক শাহেদ আলী, প্রফেসর আশরাফ ফারুকীসহ অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিবগর্র অবৈতনিক নৈশকালীন ক্লাস করার। নজরুল ইসলামের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁদের সাহচর্যে যাওয়ার ও স্নেহভাজন হওয়ার। বই পড়া এবং লাইব্রেরী গড়ে তোলার প্রতি তীব্র আগ্রহ আরও গভীরভাবে মাথায় চেপে বসে তখন থেকেই। বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে অর্থাভাবে ও পারিবারিক কারণে তার লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে। চাকরি নেন মুডী ফিল্মস কর্পোরেশনে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাথে কাজ করে ১৯৬৯ সালে আরও বৃহত্তর কিছু করার লক্ষ্যে এম. এল নজরুল ইসলাম সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় এসেই মুগদাপাড়ায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন মৌচাক ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি। যাঁরা বই পড়তে ইচ্ছুক কিন্তু কোন পাঠাগারে যাওয়ার সময় নেই ফলে বই পড়া হচ্ছিল না, তাঁদের জন্যই তিনি এই ভ্রাম্যমান পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। বুকশেলফসহ বড় ধরনের ভ্যান গাড়িতে করে ঢাকার বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পাঠকদের পছন্দমত বই আদান প্রদান করত এই মৌচাক ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি। এইভাবে ঢাকায় হাজার হাজার নতুন পাঠক সৃষ্টি করেছিল এই লাইব্রেরীটি। এর মাঝে তিনি বাংলাদেশের ৩টি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ও ৫টি সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৮৭ সালে পাবনার বেড়া উপজেলার কাশীনাথপুরে তিনি নিজ উদ্যোগে ও অর্থ ব্যয়ে এবং একটি ভাড়া ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন উত্তরণ লাইব্রেরি (সাধারণ পাঠাগার)। বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্থানীয় জনগণকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করে এলাকায় হাজার হাজার পাঠক সৃষ্টি করেছেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়নের মাঝেও গত ৩০ বছর থেকে সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে পাঠাগার পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে পাঠাগারটি তার নিজস্ব জমিতে আধাপাকা ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। এক সাথে ৫০ জন বসে বই ও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা পড়াশোনা করতে পারে। নজরুল ইসলাম স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে গভীরভাবে জড়িত। ছোট থেকে এ পর্যন্ত ছড়া, ছোটগল্প, প্রবন্ধ নিবন্ধ কবিতা উপন্যাস প্রভৃতি লিখে আসছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৭টি। সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ৪৯টি। প্রায় ৫০ বছর ধরে মানুষকে বই পড়িয়ে আনন্দ পাচ্ছেন, অন্যকেও আনন্দ দিচ্ছেন।

তার প্রতিষ্ঠিত উত্তরণ লাইব্রেরী সম্পর্কে আলাপকালে কয়েক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জানান, এই উত্তরণ লাইব্রেরীর কারণেই তারা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পেরেছেন। তারা জানান, ছোটবেলা থেকেই উত্তরণ লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মে এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তাই ভালো ফলাফলের দেখা পাই।

নজরুল ইসলাম বলেন, আমি আর কতদিন? জীবন সায়াহ্ণের শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। ভবিষ্যত নিয়ে এই বই পাগল মানুষটি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, কোন উত্তরসূরী পাচ্ছি না যে লাইব্রেরীটির হাল ধরে তাকে শঙ্কামুক্ত করে তার স্মৃতিকে ধরে রাখবে। তার মতে এ উদ্যোগ সরকারেরই নেয়া উচিত। 

শেয়ার করুন:

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...